মোহাম্মদ রোমান হাওলাদার

রাত অনুমান ৩ টা। কোলের বাচ্চার কান্নার শব্দ কানে আসতেই ঘর থেকে বেড়িয়ে নদীর পাড়ে গিয়ে কান পাতলাম। খানিকটা দাড়িয়ে লক্ষ করলাম নদীর মাঝখানে ভাসমান কোন এক বেদে পরিবারের ছোট বাচ্চা কাঁদছে। বাচ্চাটির মা কান্না থামানোর জন্য চেষ্টা করছে। কিছুক্ষন পর কান্না থেমে গেলে নৌকায় ঘুমি পরে বেদে পরিবারটি। এভাবে খোলা আকাশের নিচে দিন মাস বছর পাড় করছেন নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত বেদে সম্প্রদাযের লোকেরা। বেদে সম্প্রদায়ের জীবন যাপন একেবারেই সাদামাটা। খুব ভোরে নৌকা নিয়ে বেরিয়ে পরতে হয় তাদের। জল আর ডাঙাই যেন যাদের নিত্যসঙ্গী। নাগরিক অধিকার আছে তবে নেই নাগরিক কোন সুযোগ সুবিধা। বেদে সম্প্রদায় বাংলাদেশের একটি যাযাবর জনগোষ্ঠী। নৌকায় যাদের বসবাস। আগে তারা নৌকায় করে বিভিন্ন এলাকায় অস্থায়ী ভাবে অবস্থান করেলেও বর্তমান দিনে বেদে সম্প্রদায়ের লোকজন নৌকাতেই জীবন যাপন করে আসছেন। প্রায় অর্ধশত বছর ধরে মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে বসবাস রয়েছে তাদের। বিশেষ করে যে সব এলাকায় নদী রয়েছে সেসব এলাকায় তাদের অস্থায়ী বসবাস লক্ষ করা যায়। গ্রামে গ্রামে ঘুরে চুড়ি ফিতা ফেরি করে বিক্রি করার পাশাপাশি নদীতে মাছ ধরে কোনো রকমে কেটে যাচ্ছে বেদেদের জীবন। বেদে সম্প্রদায়ের জন্ম, বিয়ে এবং সকলের শেষ ঠিকানা যেখানে ওদেরও শেষ ঠিকানা সেখানে, মূলত স্থায়ী আবাসনের অভাবে বেদেদের সন্তানদের পড়ালেখার তেমন কোন সুযোগ নেই। তাই বেদে বহরের সদস্যরা স্থায়ী আবাসনের দাবী জানিয়েছেন সরকারের কাছে। স্থায়ী আবাসন হলে দীর্ঘ দিনের ভাসমান জীবন থেকে বেরিয়ে এসে স্বাভাবিক ও স্থায়ী জীবন-যাপনে যুক্ত হতো তারা। তাদের সন্তানরা শিক্ষা, স্বাস্থ্যের মত মৌলিক চাহিদা পূরণে সক্ষম হতো বলে বেদে সম্প্রাদাযের লোকজন আশাবাদ ব্যক্ত করেন। সরেজমিনে, মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলার ১৪টি ইউনিয়ন সমূহ ঘুরে ইউনিয়ন সমূহের মধ্যে প্রায় ৮টি ইউনিয়নে বেদেদের বসবাসের চিত লক্ষ করা যায। এর মধ্যে মালখানগর ইউনিয়নের তালতলা বাজার ডাক বাংলোর পার্শ্ববর্তী ইছামতি নদীর তীর ঘেঁষে বেদে পল্লী ও সিরাজদিখান বাজার সংলগ্ন ইছামতি নদীর তীরের বেদে পল্লী উল্লেখযোগ্য। এদুটি বেদে পল্লীতে প্রায় একশটি বেদে পরিবার বসবাস করে করে আসছেন। জানা যায়, তারা এ এলাকায় প্রায় ৫০ বছরেরও অধিক সময় ধরে বসবাস করে আসছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেদে সম্প্রদায়ের এক নারী জানান, আমরা এখানে বহুদিন ধরে বসবাস করে আসছি। আমরা এখানকার ভোটারও। আমাদের মধ্যে অনেকেই এ এলাকার নাগরিক, তবে কোন নাগরিক সুবিধা আমরা পাই না। নদীতে মাছ ধরে আর চুড়ি ফিতা ফেরী করে কোনো মতে চলছে আমাদের জীবন। চেয়ারম্যান মেম্বাররা ভোটের সময় আসে ভোট শেষে আর কেউ খোঁজ নেয়না। নদীর পাড়ে অথবা কত স্থানে সরকারি কত জমি খালী পরে থাকে। সরকার যদি সেসব জায়গায় আমাদের থাকার জন্য ব্যবস্থা করে দিতো তাহলো আমরা আমাদের জীবন মান উন্নয়নের পাশাপাশি ছেলে সন্তানদের মানুষের মত মানুষ করে তুলতে পারতাম।